কর্মব্যস্ততার ফাঁকে মনটা বারবার ছুটে যেতে চাইছিল পাহাড়ে। সুযোগ মিলতেই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া। গন্তব্য কালিম্পংয়ের ছোট্ট, নিরিবিলি পাহাড়ি গ্রাম ইচ্ছেগাঁও। স্থানীয়ভাবে ইচেগাঁও নামেও পরিচিত এই গ্রাম। পাহাড়ের কোলে সাজানো এক শান্ত ঠিকানা। যেখানে নেই শহরের কোলাহল, নেই ব্যস্ত জীবনের চাপ। আছে শুধু সবুজ পাহাড়, ভেসে বেড়ানো মেঘ আর প্রকৃতির মাঝে কয়েকটা দিন নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ।

গড়িয়া স্টেশন থেকে শুরু হয় আমাদের যাত্রা। ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেনে প্রায় চল্লিশ মিনিটের সফর শেষে পৌঁছে যাই শিয়ালদহ। সেখান থেকে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে রওনা নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশ্যে। তৎকালে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠেছিলাম আমরা। রাতের খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়ি। কলকাতার গরম আর ব্যস্ততা পিছনে ফেলে তখন আমাদের গন্তব্য উত্তরবঙ্গ। সকালে ঘুম ভাঙতেই জানলার বাইরে বদলে যাওয়া প্রকৃতি। মেঘলা আকাশ, রাতের বৃষ্টিতে ভেজা চারপাশ। ময়নাগুড়ি পেরিয়ে নির্ধারিত সময়েই পৌঁছে যাই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে তখন চলছে ব্যাপক নির্মাণকাজ। সেখান থেকে টোটোয় পৌঁছে যাই শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাসে। কালিম্পং যাওয়ার বাসভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। যদিও আমাদের সরকারি প্রেস পরিচয়পত্র থাকায় ভাড়া দিতে হয়নি। শিলিগুড়ির যানজট পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তা শুরু হতেই বদলে যায় সফরের অনুভূতি। একদিকে খরস্রোতা তিস্তা, অন্যদিকে সবুজে ঢাকা পাহাড়। কখনও কালো মেঘ, কখনও মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া রোদ। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতেই এগিয়ে চলা কালিম্পংয়ের পথে। তবে কালিম্পং শহরে ঢোকার মুখে যানজটে বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত কালিম্পং পৌঁছে ইচ্ছেগাঁও যাওয়ার জন্য একটি গাড়ি বুক করি। চারজনের জন্য ভাড়া পড়ে ১২০০ টাকা। পর্যটকের চাপ অনুযায়ী এই ভাড়া কমবেশি হতে পারে।

এরপর শুরু হয় সফরের আরও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। রামধুরা পেরিয়ে ইচ্ছেগাঁওয়ের দিকে এগোতেই বদলে যায় রাস্তার চরিত্র। সরু, খাড়া ও পাথুরে পাহাড়ি পথ। কোথাও তীক্ষ্ণ বাঁক, কোথাও খাড়াই। এই পথে গাড়ি চালাতে প্রয়োজন অভিজ্ঞ চালকের। শেষ পর্যন্ত গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ৫০০ মিটার খাড়া পথ হেঁটে পৌঁছতে হয় আমাদের হোমস্টেতে। কারণ থাকার জায়গাটি গ্রামের একেবারে উপরের দিকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই যেন উধাও হয়ে যায় দীর্ঘ সফরের সমস্ত ক্লান্তি। ঘরের জানলা খুলতেই চোখের সামনে পাহাড়ের সারি। চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। কখনও সেই মেঘ ঢুকে পড়ছে ঘরের ভিতরেও। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজেই আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। কলকাতা থেকে ট্রেন, তারপর বাস, গাড়ি এবং শেষ পর্যন্ত পাহাড়ি পথে হাঁটা—দীর্ঘ সফরের শেষে এমন এক ঠিকানায় পৌঁছনোর অনুভূতিই আলাদা।
