দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি বিধানসভা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস বলছে, ১৯৭২ সালে একমাত্র কংগ্রেস প্রার্থী অরবিন্দ নস্কর এই কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছিলেন। তারপর প্রায় টানা তিন দশকেরও বেশি সময় এই কেন্দ্র ছিল বামেদের দখলে, বিশেষ করে এসইউসিআইয়ের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল এখানে। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা আটবার এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন এসইউসিআই প্রার্থীরা, যা কুলতলিকে বাম রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুর্গে পরিণত করে।
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের হাওয়া লাগলেও কুলতলিতে বামেদের প্রভাব বজায় ছিল। তবে এসইউসিআইয়ের পরিবর্তে সেই সময় বামফ্রন্টের শরিক সিপিএম প্রার্থী রামশঙ্কর হালদার জয়লাভ করেন। তিনি ২০১১ এবং ২০১৬—পরপর দু’বার এই কেন্দ্রের বিধায়ক নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনেও বামফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে রয়েছেন রামশঙ্কর হালদার। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন কুলতলির রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনে। এই প্রথম তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী গণেশ চন্দ্র মন্ডল জয়লাভ করেন। ১,১৭,২৩৮ ভোট পেয়ে তিনি ৪৭,১৭৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। এই জয় শুধু দলীয় সাফল্য নয়, বরং কুলতলির ভোট সংস্কৃতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—যে দলের সরকার, সেই দলের প্রার্থী জয়ী হওয়ার নতুন ধারা তৈরি হয় এই কেন্দ্রে।
একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তি বাড়ায় বিজেপিও। ২০২১ সালে বিজেপি প্রার্থী মন্টু হালদার ৭০,০৬১ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসেন, পিছনে ফেলে দেন এসইউসিআই ও বামফ্রন্টকে। ফলে এবারের নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সরাসরি লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। এবার এসইউসিআই প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন শঙ্কর নস্কর। তবে সংগঠনের দুর্বলতা এবং ভোটব্যাঙ্কে ক্রমশ ধস দলীয় নেতৃত্বের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বাম প্রার্থী রামশঙ্কর হালদারের অভিযোগ, রাজ্যের ভোট সংস্কৃতি বদলে গিয়ে এখন ‘মানি পাওয়ার’ ও ‘মাসল পাওয়ার’-এর প্রভাব বেড়েছে। তবুও তিনি মানুষের সমর্থনের উপর ভরসা রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দাবি, কুলতলির অধিকাংশ উন্নয়নই বাম আমলে হয়েছে।
বর্তমান বিধায়ক ও তৃণমূল প্রার্থী গণেশ চন্দ্র মন্ডল সরকারের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের উপর আস্থা রাখছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ, পানীয় জল, নদীবাঁধ ভাঙন ও কর্মসংস্থানের মতো সমস্যাগুলি রয়ে গিয়েছে। এই ইস্যুগুলিই এবারের নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা নিতে চলেছে। এদিকে বিজেপি ও তৃণমূল সমানে সমানে প্রচার চালালেও অন্যান্য দল কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। শেষ মুহূর্তে কংগ্রেসও প্রার্থী দিয়েছে—রূপা হালদারকে। তবে সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অর্থের সীমাবদ্ধতায় বিজেপি ও তৃণমূলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে অন্যান্য দলগুলির জন্য। সব মিলিয়ে কুলতলিতে এবারের লড়াই জমে উঠেছে ত্রিমুখী সংঘর্ষে। রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে, আর ফলাফল কী হবে তা জানা যাবে আগামী ৪ঠা মে—সেই দিনই নির্ধারণ করবে কুলতলির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিশা।
